English|Bangla আজ ৯ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭:৪৬
শিরোনাম

আজ ভোলায় কোকো-৪ লঞ্চ দুর্ঘটনার দশ বছর

সোহেব চৌধুরী ভোলা প্রতিনিধি:

২০০৯ সালের এই দিনে রাত ১১টায় ঢাকা থেকে লালমোহনগামী ঈদ উল আযহার ঘরমুখো দুই হাজারেরও বেশি যাত্রীনিয়ে এমভি কোকো-৪ লঞ্চটি ঘাটের কাছাকাছি এসে কাত হয়ে ডুবে যায়। এ দুর্ঘটনায় নারী, পুরুষ ও শিশু সহ ৮৩ জন প্রাণ হারায়। দিনন মাস ও বছর ঘুরে এদিনটি এলেও আজও স্বজনহারাদের কান্না থামেনি।

বেঁচে যাওয়া যাত্রী ফারুক ও শাহে আলমজানান, লঞ্চটি অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঢাকাসদরঘাট থেকে ছেড়ে আসার সময় বুড়িগঙ্গা নদীপাড় হলে লঞ্চটির তলা ফেটে যায়। তবুও ঝুঁকিনিয়ে লঞ্চটি লালমোহনের উদ্দেশ্যে আসছিল।যাত্রীরা লঞ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদনজানিয়েও তীরে নামতে পারেননি। লঞ্চ কর্তৃপক্ষতাদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিল।

লালমোহন লঞ্চঘাটের কাছাকাছি নাজিরপুর লঞ্চ ঘাটে এমভিকোকো ৪ আসা মাত্র যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করেনামতে গেলে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ ভাড়া আদায় করতেপারবে না ভেবে লঞ্চটি আবারও মাঝ নদীতেনেওয়ার চেষ্ঠা করে। একে অতিরিক্ত যাত্রী তারউপর তলা ফেটে যাওয়ায় পানি প্রবেশ করছিল।এক পর্যায়ে লঞ্চটি ডান দিকে কাত হয়ে ডুবে যায়। আর এতেই ঘটে দুর্ঘটনা। কিছুক্ষণ পরথেকে শুরু হয় উদ্ধার অভিযানে উঠে আসেএকের পর এক লাশ। স্বজনদের কান্নায় সেদিনলালমোহনের আকাশ ভারী হয়ে ওঠেছিল।

ওই দিনের ট্র্যাজেডিতে একই পরিবারের ৩জনকে হারিয়ে এখনও শোকের মাতম চলছেলালমোহনের চর-ছকিনা গ্রামে যশোর নামকবাড়িতে। ওই বাড়ির বাসিন্দাদের ঈদুল আযহাকেটেছে তেঁতুলিয়া পাড়ের স্বজনদের খোঁজে।তার পর থেকে ঈদুল আজহা কাটে হারানোস্বজনদের শোকে। সংসারের একমাত্রউপার্জনক্ষম ছেলে নুরে আলাম (২৬)। সেইঢাকার দারুস সালম এলাকায় গার্মেন্টসে চাকরিকরতেন। সেখানের গার্মেন্টসকর্মী ময়মনসিংহজেলার ইয়াছমিন (২০) এর সাথে প্রেমের সর্ম্পকের মাধ্যেমে বিয়ে হয়। বিয়ের কিছু দিন পর বাবামাকে নতুন বধূকে দেখাবে বলে শ্যালিকা রেপো(১৭) কে সাথে নিয়ে দেশের উদ্যোশে রওনা হয়। নতুন বধূকে বাবা মাকে না দেখাতে বাড়ির কাছে এসে শ্যালিকা সহ তিন জনে প্রাণ কেড়ে নেয়নিষ্ঠুর কোকো। তার পর থেকে ছেলে ও পুত্রবধূপ্রতিচ্ছবি নিয়ে বেঁচে আছেন ক্ষেতমজুর আব্দুররশিদ ও মালাল ভানু।

অপরদিকে একই এলাকার বাকলাই বাড়িরশামসুন নাহার স্বামী, সন্তান, দেবরসহ একইবাড়ির ১৬ জন নিয়ে কোকো লঞ্চে রওনাহয়েছিল বাড়িতে ঈদ করার জন্য। বাড়ির কাছেরঘাটে এসেই লঞ্চডুবিতে নিহত হয় তার মেয়েসুরাইয়া (৭), ভাসুরের মেয়ে কবিতা (৩) ও দেবরসোহাগ (১৪)। সেই থেকেই শামসুন নাহারআদরের মেয়ের শোকে কাতর। শামসুন নাহারেরমত এ লঞ্চ দুর্ঘটনায় কেউ হারিয়েছেন পিতা-মাতা, কেউ হারিয়েছে সন্তান, কেউবা ভাই-বোনআর পরিবারের উপর্জনক্ষম ব্যাক্তি।

এই দূর্ঘটনায় অনেকেই সাতরিয়ে তীরে উঠতেপারলেও লালমোহনে ৪৫জন, চলফ্যাশনে৩১জন, তজুমদ্দিনে ২ ও দৌলতখানে ৩ জনসহমোট ৮১ জন নারী, শিশু ও পুরুষ প্রাণ হারা।

ভয়াবহ স্মরণকালের এ লঞ্চ দূর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের খবর রাখেনি কেউ। স্বজনহারাদেরপরিবারে এখনো চলছে নীরব কান্না। ছেলে-সন্তান হারা অনেক বাবা-মার স্বপ্ন রয়ে গেছেঅপূর্ণ। পরিবারের একমাত্র উপর্জনকারীকেহারিয়ে আগের অবস্থায় এখনো ফিরে আসতেপারেনি অনেক পরিবার। কেউ কেউ ঘর-বাড়িছেড়ে চলে গেছেন ঢাকা ও চট্টগামে। দূর্ঘটনারপর নিহতদের পরিবারকে সরকারিভাবে কিছুআর্থিক সাহায্য করা হলেও পূণর্বাসনের কোনোউদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এব্যাপারে ভোলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(রাজস্ব) মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, এ দুর্ঘটনানিহতের পরিবারকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবরকম সহযোগীতা করা হয়। ভবিষ্যতে যাতে আরকোন নৌ দুর্ঘটনা না ঘটতে পারে বিশেষ করেঈদের সময় অতিরিক্ত যাত্রী ও ফিটনেস বিহীনলঞ্চ যাতে না চলতে পারে সে ব্যাপারে তাদেরসজাগ দৃষ্টি রয়েছে বলে তিনি জানান।

স্বজনহারা পরিবার গুলোর দাবি, লঞ্চমালিকদের খামখেয়ালির জন্য আর যেন কোনোমাকে সন্তান হারাতে না হয়। স্ত্রীকে যেন অকালেবিধবা হতে না হয়। কোকো ট্রাজেডির ছয় বছরপেরিয়ে গেলেও আজও এ রুটে চালু হয়নিনিরাপদ লঞ্চ। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়েই প্রতিদিনচরম ঝুঁকির মধ্যে যাতায়াত করছে এই রুটের লঞ্চগুলো একই সাথে দোষীদের বিরুদ্ধে নেয়াহয়নি কোন ধরনের ব্যবস্থা।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো