English|Bangla আজ ১৫ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার সকাল ১০:৪৩
শিরোনাম

অর্থ সম্পদ নয় নেতাকর্মীদের ভালোবাসাই আমার শক্তি : শেখ হাসিনা

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ নিয়ে টানা নবমবারের মতো দলটির সভাপতি নির্বাচিত হলেন তিনি। আর টানা দ্বিতীয়বারের মতো দলটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন ওবায়দুল কাদের।

শনিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে দলের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশনে নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান এডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন এ কমিটি ঘোষণা করেন। নতুন নেতা নির্বাচনের সময় সভাপতিমন্ডলীর সদস্য এডভোকেট আবদুল মতিন খসরু সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনার নাম প্রস্তাব করেন। এই প্রস্তাব সমর্থন করেন সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য পিযুষ কান্তি ভট্টাচার্য। আর সাধারণ সম্পাদক পদে ওবায়দুল কাদেরের নাম প্রস্তাব করেন আগের কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক। প্রস্তাবে সমর্থন করেন আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান। উপস্থিত কাউন্সিলরদের সর্বসম্মতিতে তা পাশ হয়। পরে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাদের দুইজনের নাম ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।

এর আগে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে নতুন নির্বাচনের লক্ষে নির্বাচন কমিশনের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। কমিটি বিলুপ্ত হলে নির্বাচন কমিশনার অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনের নেতৃত্বে ড. মসিউর রহমান ও অধ্যাপক সাইদুর রহমান খান দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নাম প্রস্তাব আহ্বান করেন।

কাউন্সিল অধিবেশন শেষে ৮১ সদস্যের কাযনির্বাহী কমিটির মধ্যে ২৮ জনের নাম ঘোষণা করেন সভাপতি শেখ হাসিনা। পাশাপাশি দলের উপদেষ্টা পরিষদ (আংশিক), প্রেসিডিয়াম এবং সংসদীয় ও স্থানীয় সরকার মনোনয়নবোর্ডের সদস্যদের নামও ঘোষণা করেন তিনি।

নতুন ঘোষিত আংশিক কমিটিতে এখনো পর্যন্ত বাদ পড়েছেন মন্ত্রীসভার ছয় জন সদস্য। বহাল রয়েছেন চারজন। পদোন্নতি হয়ে প্রেসিডিয়ামে ঠাঁই পেয়েছেন দুই জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। একজন সাংগঠনিক সম্পাদক এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক পদোন্নতি পেয়ে যুগ্ম সাধারণ হয়েছেন।

পুনরায় সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে বলেন, ‘দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের দায়িত্বে আছি। ৩৯ বছর চলছে। আমি কোনও পদে থাকি বা না থাকি আওয়ামী লীগে আছি, এখানেই থাকবো। এটাই আমার পরিবার। আমার আপনজন যাদের রেখে গেছিলাম তাদের কাউকে পাইনি। তবে আমি পেয়েছিলাম বিশাল একটা পরিবার, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। নেতাকর্মীদের ভালোবাসাই আমার চলার পথের শক্তি। আমার অর্থ, সম্পদ নেই। আওয়ামী লীগের যে অগণিত নেতাকর্মী, তাদের স্নেহ-ভালোবাসাই আমার চলার পথে শক্তি। সেজন্য চেষ্টা করেছি সংগঠনকে গড়ে তুলতে। তবে সামনে আপনাদের ভাবতে হবে। আমার ৭৩ বছর বয়স হয়েছে। এটা ভুলে গেলে চলবে না। নতুন নেতা নিয়ে ভাবতে হবে। দলকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।’

দলের কাছ থেকে নিজের ‘ছুটি’ প্রত্যাশা করেছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি চাচ্ছিলাম যে এই দীর্ঘ দিন আওয়ামী লীগের দায়িত্বে ছিলাম, অন্তত আমাকে একটু ছুটি দেবেন। ৩৮টি বছর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বে আছি, ৩৯ বছর হতে চলছে। তাই একটু ছুটি দেবেন চাচ্ছিলাম। কিন্তু যে গুরু দায়িত্ব আপনারা আমাকে দিয়েছেন তা যেন যথাযথভাবে পালন করতে পারি তার জন্য সবার দোয়া চাই, সমর্থন চাই।’

দ্বিতীয়বার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ায় ওবায়দুল কাদেরকে অভিনন্দন জানিয়ে সভাপতি বলেন, ‘এবার আপনারা আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন নতুন পর্ষদ গঠনের। ওবায়দুল কাদের পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। আর সভাপতি হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি আমার সাধারণ সম্পাদককে অভিনন্দন জানাই। আমরা দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে কাজ করছি। ছাত্রলীগ থেকেই আমাদের সবার যাত্রা শুরু।’

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। এতে প্রত্যেক বিভাগ থেকে একজন করে জেলা সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদক বক্তব্য রাখেন। কাউন্সিলে দলের উপদেষ্টা পরিষদ ৪১ সদস্য থেকে ৫১ সদস্যবিশিষ্ট করা, আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগকে সহযোগী সংগঠনের স্বীকৃতি দেয়াসহ গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন সংশোধনী ও বাজেট পাশ করা হয়।

শুক্রবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন শুরু হয়। দুই দিনের সম্মেলনের গতকাল ছিল শেষ দিন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাড়ে সাত হাজার কাউন্সিলর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনে অংশ নেন।

আওয়ামী লীগের যথারীতি এবারের জাতীয় সম্মেলন ঘিরেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দলের সাধারণ সম্পাদক পদ। কে আসবে এই পদে, এ নিয়ে ছিল নানা গুঞ্জন। কারণ, সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনার বিকল্প কারো নাম আলোচনায় আসেনি। তাই সভাপতি হিসেবে তার নাম ঘোষণা ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতার বিষয় মাত্র। এ কারণে সবার নজর ছিল দলের দ্বিতীয় শীর্ষ পদটির দিকে। এ পদে আলোচনার শীর্ষে ছিলেন ওবায়দুল কাদেরই। এছাড়াও আলোচনা ছিলো মাহবুবউল আলম হানিফ, ডা: দীপু মনি, ড. হাছান মাহমুদ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান ও খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর নাম। তবে শেষ পর্যন্ত ওবায়দুল কাদেরকেই ফের দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়েছে।

দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত সভাপতি হয়েছেন সাতজন। আর সর্বোচ্চ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি নবমবারের মতো দলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তিনবার করে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ দুইবার এবং এএইচএম কামারুজ্জামান ও আবদুল মালেক উকিল একবার করে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন ৭৫ পরবর্তী পরিস্থিতিতে একবার দলের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত দলের দ্বিতীয় শীর্ষ পদ ‘সাধারণ সম্পাদক’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন নয়জন। সবচেয়ে বেশি চারবার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিল্লুর রহমান। এছাড়া তাজউদ্দিন আহমেদ তিনবার, আবদুর রাজ্জাক, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী দুইবার করে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও আবদুল জলিল একবার করে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন ওবায়দুল কাদের।

১৯৮১ সাল থেকে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে আছেন। ৩৮ বছর ধরে তিনি এই দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৬ সাল থেকে দলের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন ওবায়দুল কাদের ।

শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে আ’লীগ: এদিকে শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আওয়ামী লীগ কাজ করবে জানিয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আমরা প্রতিপক্ষকে দুর্বল ভাবি না। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে চাই। এজন্য বিরোধী দলের প্রত আমরা সহানুভূতিশীল। তারা কোনও সভা-সমিতি করতে চাইলে আমরা তাদের সে সুযোগ দিতে চাই।’

আওয়ামী লীগের ২১তম সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে গতকাল বিকালে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমাদের অফিসে আক্রমণ হয়েছিল। আমরা আক্রান্ত হয়ে পাল্টা আক্রমণ করিনি। তবে জনগণের জানমালের স্বার্থে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু আমরা করেছি।’

সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনি ইশতেহার দিয়েছেন নেত্রী শেখ হাসিনা। জনগণের কাছে তিনি অঙ্গীকার করেছেন, প্রত্যেক পরিবারে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন। সেই প্রতিশ্রুতি আমরা পূরণ করবো। এগুলো আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল ফোকাস হলো মুজিববর্ষের বিশাল প্রেগ্রাম সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা। এটা আমাদের একটা বিরাট দায়িত্ব। এছাড়া ভিশন-২০২১ ও ডেল্টাপ্ল্যান বাস্তবায়নও আমাদের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে।’

আওয়ামী লীগের এবারের সম্মেলনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সুশৃঙ্খল ও ঐতিহাসিক মন্তব্য করে নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমাদের এখনও অনেক কাজ বাকি। আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। আমরা গণতান্ত্রিক দল। সাধারণ সম্পাদক পদে আসার মতো যোগ্যতা আমার নেই। আমি অসুস্থতা থেকে আপনাদের মাঝে ফিরে এসেছি। মমতাময়ী মায়ের মতো তিনি (শেখ হাসিনা) আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। কলিগরাও অনেক কষ্ট করেছেন।

আমাদের সহযোগী সংগঠনগুলো কাজ করেছে। সাংবাদিকরাও দিন-রাত পারিশ্রম করেছেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থীদের নাম তিনবার করে নির্বাচন কমিশন জানতে চেয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় আমাদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত করার জন্য শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, শেখ রেহানাকেও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো